0

পরিচিত এক বড়ভাই সেকেন্ড ইয়ারে থাকাকালীন ফার্স্ট ইয়ারের এক মেয়েকে প্রোপোজ করেছিলেন । মেয়েটি তাকে "আমার ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে হবে; তোমার সাথে রিলেশনে যাওয়া সম্ভব নয়"-এই বলে রিজেক্ট করে। ভাই মোটামুটি সুশ্রী , আচার ব্যবহারেও ভদ্র; মানুষ হিসেবে পরিশ্রমী। বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে সিলেক্টেড হয়ে যাবার স্ট্যাটাসে সেই মেয়ের কমেন্ট আর তারপর ইনবক্সের আলাপ থেকে ভাই বুঝতে পারলেন মেয়ে তাঁর সাথে রিলেশনে আসতে আগ্রহী। কিছুদিন কথা চালানোর পর মেয়েই তাকে ডেটে যাবার জন্য প্রস্তাব দিল। ভাই মেয়েটিকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে ডেটে গেলেন। খাওয়া দাওয়ার পর মেয়েটি ভাইকে প্রোপোজ করে এবং ভাই খুবই সুন্দরভাবে তাকে রিজেক্ট করে দেন। মেয়েটির প্রতি ভাইয়ের শেষ কথা ছিল-"আমার ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে হবে, তোমার সাথে রিলেশনে যাওয়া সম্ভব নয়"।
ভাই ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবেননি। বাড়ীতে এসে মা বাবার পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করেছেন। বিয়ের আসরে এক ফাঁকে আমাদের এ কথাগুলো বলতে বলতে উপদেশ দিয়েছিলেন-" এমন কাউকে ভালবাসবি না যে তোর থেকে তোর ক্যারিয়ারের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট, এমন কাউকে যদি ভুলেও ভালবেসে ফেলিস তাকে বিয়ে করিস না। বিয়ে এমন কাউকে কর যে তোকেই বেশি ভালবাসে"।
ভাই যৌতুকপ্রবণ অঞ্চলে সম্পূর্ণ যৌতুকবিহীন বিয়ে করেছিলেন। বর্তমানে ভাই ও ভাবী খুবই সুখে আছেন।
-আমি বলতে চাচ্ছি না, রিজেক্ট খাওয়া সবাই গণহারে বিসিএস ক্যাডার হয়ে প্রতিশোধ নেন।আমার শুধু একটা প্রশ্ন করার আছে।
আমরা কি মানুষের চেয়ে তাঁর ক্যারিয়ারকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি না? মানুষকে কি আমরা একটা প্রোডাক্ট হিসেবে ইউজ করছি না?
আমার একটা প্রশ্ন- আমাদের কতজনের বাবা মায়ের মধ্যে ডিভোর্স হয়েছে?
আমি বিশ্বাস করি উত্তরটা হবে- "একজনেরও না"।
কেন আমাদের বাবা মায়ের মধ্যকার সম্পর্কগুলো এত দৃঢ়? উত্তরটা সোজা। তারা একজন আরেকজনকে পণ্য হিসেবে দেখেন নি, উপযোগ খুঁজতে যাননি। তাদের মধ্যে ইগোর ঝামেলা নেই, নেই এম্বিশন নামক জটিলতা।
আমার আম্মা লেখাপড়া জানেন না, মাথায় চুলও কমে যাচ্ছে আমাদের জ্বালাতনে, নিজের যে দুয়েক ভরি গহনা ছিল সেগুলোও বছরকয়েক আগে চোর চুরি করে নিয়ে গেছে। আম্মাকে শুনিনি আব্বার সাথে এ নিয়ে কোন অভিযোগ করতে। আম্মার সদ্যই চিকুনগুনিয়া হয়েছিল। রাঁধতে পারেননি, তীব্র জ্বরে বিছানা থেকে উঠতে পারেননি। আব্বা রাত ১১ টায় অফিস থেকে এসে ভাত রেঁধেছেন, আলুভর্তা বানিয়েছেন আরপর সেই আলুভর্তা দিয়ে ভাত মেখে আম্মাকে খাইয়ে দিয়েছেন। আমরা ভাইবোনেরা সে দৃশ্য দেখে হেসেছি। আম্মাকে দুদিন আগে জিজ্ঞেস করলাম-"বলতো আম্মা, আব্বা আর তুমি এত সুখী কেন? ঝগড়া করো না কেন একবারও ? এইটা কেমন কথা"
আম্মার জবাবটা খুবই সিম্পল ছিল। " তোর আব্বার আর আমার কোন লোভ নাই " ।
আসলেই তো। সম্পূর্ণ লোভবিহীন দুইটা মানুষ। বিয়ের পর আব্বা তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে একটা হাতঘড়িও আনেননি। আম্মাও সেইরকম- ভার্সিটির রেজাল্টের পর এক স্বনামধন্য কোচিং সেন্টার থেকে বলা হয়েছিল -"ছবি আর লেখা দিয়ে টাকা নিয়ে যেতে"।আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম "কত টাকা?" উত্তরে যে টাকার অংক শুনেছি তা আমার আব্বার এক বছরের ইনকাম। আম্মাকে বলতেই আম্মা বলেছিলেন-" কোন কোচিং থেকে ভুয়া কথা বইলা একটা টাকাও যদি আনস, আমার ঘরে ঢুকবি না "। এমন দুইটা মানুষ সুখী না হলে কে হবে?
আমরা যারা প্রেম করি ক্যারিয়ার দেখে, রিলেশনে যেতে চাই বিসিএস ক্যাডার দেখে , ভালবেসে ফেলি চামড়ার সৌন্দর্য দেখে তাদের ডিভোর্স হবে না তো কার হবে? আমরা মানুষকে প্রোডাক্ট ভাবি কিন্তু এটা ভাবি না যে সব প্রোডাক্টের উপযোগই একসময় শেষ হয়ে যায়, অনেক প্রোডাক্টেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে....

Post a Comment

 
Top